Skip to content
Other

আড়ি পেতে শিকার

ব্যাঙ-খেকো বাদুড়ের বুদ্ধির গল্প

একটা শব্দ, একটা খাবার!

এমন কোনো শব্দ আছে, যেটা শুনলেই তোমার পছন্দের খাবারের কথা মনে পড়ে? হয়তো বন্ধু চিপসের প্যাকেট খুলল, কিংবা কোথাও খই ফুটছে। শব্দ শুনেই তুমি বুঝে গেলে, মজার কিছু আসছে!

শুধু মানুষ নয়, অনেক প্রাণীও শোনার ওস্তাদ। তোমার বাড়িতে কুকুর বা বিড়াল থাকলে দেখবে, খাবারের বাটি তুলতেই ওরা কোথা থেকে যেন ছুটে আসে!

কিছু বাদুড়ও খাবার খুঁজে পেতে শব্দের ওপর ভরসা করে। কিন্তু শিকারের ডাক শুনে তারা ঠিক কতটা খবর পায়, সেটা বিজ্ঞানীরা জানতেন না। তাই তাঁরা একটা মজার পরীক্ষা করলেন।

“আড়ি পাতা” মানে কী?

প্রাণীরা খাবার খোঁজে নানা উপায়ে। কেউ নাক দিয়ে গন্ধ শুঁকে খাবার খুঁজে বের করে, কেউ খুব দূর থেকে চোখ দিয়ে শিকার দেখতে পায়।

কিন্তু শুধু শব্দ শুনলেই তো হয় না! শিকারিকে ঠিক করতে হয়, শিকারটা ধরার যোগ্য কি না। ভুল শিকার ধরতে গেলে সময় আর শক্তি দুটোই নষ্ট।

কিছু শিকারি এর জন্য একটা চালাক কৌশল কাজে লাগায়, আড়ি পাতা (ইংরেজিতে eavesdropping)। শিকার যে শব্দ নিজের অন্য কাজের জন্য করে, যেমন সঙ্গীকে ডাকতে, শিকারি লুকিয়ে সেটা শুনে নেয়।

ব্যাঙের ডাক বাদুড় শুনছে এবং ব্যাঙের দিকে উড়ে যাচ্ছে
ছবি ১: ব্যাঙ ডাকে সঙ্গীকে ডাকতে, আর বাদুড় আড়াল থেকে সেই ডাক শুনে ফেলে।

ঝালরঠোঁটি বাদুড়কে চেনো

আমাদের গল্পের নায়ক ঝালরঠোঁটি বাদুড় (ইংরেজিতে fringe-lipped bat, বৈজ্ঞানিক নাম Trachops cirrhosus)। এরা ব্যাঙ আর টোড খেতে ভালোবাসে। তাই এদের ডাকনাম “ব্যাঙ-খেকো বাদুড়”।

  • নামটা কেন? ঠোঁট আর মুখের চারপাশে আঁচিলের মতো ছোট ছোট উঁচু দাগ আছে বলে।
  • চেহারা: বড় বড় কান, লম্বা নরম লোম।
  • কোথায় থাকে? মেক্সিকোর দক্ষিণ থেকে ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্ব পর্যন্ত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনে।
  • কীভাবে থাকে? সাধারণত ছোট দলে, দশটার কম। গাছের কোটর, গুহা বা পুরনো দালানে বিশ্রাম নেয়।
  • আর কী খায়? বড় পোকামাকড়, ছোট টিকটিকি, এমনকি কখনো কখনো অন্য বাদুড়ও।
মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্রে পানামা, দক্ষিণ মেক্সিকো আর দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিল চিহ্নিত
ছবি ২: বাদুড়টি যেখানে থাকে (মোটামুটি দুই প্রান্ত), আর যেখানে এই পরীক্ষা হয়েছে: পানামা।

শিকার বাছাই এত কঠিন কেন?

সব ব্যাঙ বা টোড বাদুড়ের জন্য ভালো খাবার নয়। বিজ্ঞানীরা দুই ভাগে ভাগ করেন:

  • খাওয়ার উপযোগী (ইংরেজিতে palatable): নিরাপদ, পেট ভরানো যায়।
  • খাওয়ার অযোগ্য (unpalatable): হয় অনেক বড়, সুযোগ পেলে বাদুড়কেই খেয়ে ফেলতে পারে। নয়তো বিষাক্ত, খেলে বাদুড় অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

তাই ধরার আগেই খবর জানা থাকলে বাদুড়ের অনেক সুবিধা। আর খবরটা পাওয়া যায় ডাক থেকেই!

ছোট ব্যাঙ, বিশাল টোড আর বিষাক্ত টোড, প্রত্যেকের ডাকের তরঙ্গ আলাদা
ছবি ৩: ছোট প্রাণীর ডাক চিকন আর উঁচু সুরের, বড় প্রাণীর ডাক গম্ভীর আর নিচু সুরের।

বিজ্ঞানীদের তিনটি প্রশ্ন

গবেষকেরা জানতে চাইলেন, ডাক থেকে বাদুড় আসলে কতটা খবর পায়:

১। ডাক শুনে কি বোঝা যায়, ব্যাঙ বা টোডটা খাওয়ার অযোগ্য?

২। বাদুড় কি এক প্রজাতির সঙ্গে আরেক প্রজাতির তফাত করতে পারে?

৩। বয়স বাড়লে কি এই দক্ষতা বদলায়? কিশোর বাদুড় কি বড়দের থেকে আলাদা সাড়া দেয়?

পরীক্ষাটা কীভাবে হলো?

বিজ্ঞানীরা পানামায় ঝালরঠোঁটি বাদুড়ের আচরণ দেখলেন। পুরো ব্যাপারটা ছিল অনেকটা “শব্দ-পরীক্ষা”র মতো:

পরীক্ষার ছবি: আলাদা ঘরে বাদুড়, স্পিকারে ডাক, ক্যামেরায় রেকর্ড আর স্কোর
ছবি ৪: পরীক্ষার ব্যবস্থা আর কয়েকটা জরুরি সংখ্যা।

ধাপ ১) বাদুড় ধরা: মোট ৩৯টি বাদুড় ধরা হলো, ২০টি প্রাপ্তবয়স্ক আর ১৯টি কিশোর (যারা এখনো পুরোপুরি বড় হয়নি)।

ধাপ ২) আলাদা ঘর: প্রতিটি বাদুড়কে একটা করে আলাদা ঘরে রাখা হলো।

ধাপ ৩) ডাক শোনানো: স্পিকারে ব্যাঙ-টোডের ডাক বাজানো হলো। মোট ১৬ প্রজাতির ডাক অর্থাৎ ১২টি খাওয়ার-উপযোগী, ৪টি খাওয়ার-অযোগ্য। প্রতিটি ডাকের বৈশিষ্ট্যও (কত লম্বা, কত নিচু সুর) মেপে রাখা হলো।

ধাপ ৪) সাদা শব্দ: আর একটা শব্দও বাজানো হলো: সাদা শব্দ (ইংরেজিতে white noise)। রেডিও ঠিকমতো না ধরলে যে ঝিরঝির আওয়াজ হয়, অনেকটা সেরকম।

ধাপ ৫) এলোমেলো ক্রমে: ডাকগুলো বাদুড়কে এলোমেলো ক্রমে শোনানো হলো।

ধাপ ৬) ভিডিও আর স্কোর: ক্যামেরায় বাদুড়ের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করা হলো। শিকারে বাদুড়ের আগ্রহ কতটা, তা ০ থেকে ৫ স্কোরে মাপা হলো। বেশি স্কোর মানে বেশি আগ্রহ।

ধাপ ৭। মুক্তি: পরীক্ষা শেষে সব বাদুড়কে বনে ছেড়ে দেওয়া হলো।

এরপর বিজ্ঞানীরা তিনটি জিনিস তুলনা করলেন:

  • খাওয়ার-উপযোগী বনাম খাওয়ার-অযোগ্য শিকারের ডাকে সাড়া।
  • প্রাপ্তবয়স্ক বনাম কিশোর বাদুড়ের সাড়া।
  • ডাকের বৈশিষ্ট্য (লম্বা না ছোট, নিচু না উঁচু সুর) বদলালে বাদুড়ের আচরণ বদলায় কি না।

কী পাওয়া গেল?

আবিষ্কার ১: বড় বাদুড়রা বেছে বেছে সাড়া দেয়। প্রাপ্তবয়স্ক বাদুড়রা খাওয়ার-উপযোগী প্রজাতির ডাকে বেশি স্কোর পেয়েছে, খাওয়ার-অযোগ্যদের ডাকে কম।

আবিষ্কার ২: কিশোরদের কোনো স্পষ্ট পছন্দ ছিল না। তারা মোটের ওপর দুই ধরনের ডাকের মধ্যে তফাত করেনি। এমনকি দুটো বিষাক্ত টোডের ডাকে তারা খুব বেশি সাড়া দিয়েছে!

আবিষ্কার ৩: কিশোররা সুরের বৈশিষ্ট্যে সাড়া দেয়। যেসব ডাক ছিল লম্বা, নিচু সুরের আর ধীরে ধীরে জোরালো হয়, সেগুলোতে কিশোররা বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। আর খাওয়ার-অযোগ্য প্রজাতির ডাকেই এই বৈশিষ্ট্যগুলো বেশি ছিল।

প্রাপ্তবয়স্ক আর কিশোর বাদুড়ের সাড়ার ধারণাচিত্র
ছবি ৫: ফলাফলের ধরন (সরল ধারণাচিত্র): বড় বাদুড়েরা ভালো খাবারের ডাকে বেশি সাড়া দেয়, কিশোরেরা তফাত করে না।

কেন এমন হলো?

ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীদের মনে হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাদুড়ের শিকারের পছন্দ বদলে যায়। বড় হতে হতে বাদুড় খাওয়ার-উপযোগী শিকার বেশি পছন্দ করতে শেখে। আর এটা সম্ভবত শেখা, জন্ম থেকে জানা নয়।

কিশোরেরা সম্ভবত ডাকের সুর থেকে প্রাণীর আকার আন্দাজ করছিল। আগেই জেনেছি, বড় প্রাণীর ডাক নিচু সুরের। বড় ব্যাঙ মানে বড় খাবার, তাই কিশোরদের কাছে সেগুলো লোভনীয় লাগে। কিন্তু সবচেয়ে বড়গুলো যে আসলে একেবারে বেশি বড়, সেটা বুঝতে অভিজ্ঞতা লাগে।

তাহলে “বয়স হলে বুদ্ধি বাড়ে” কথাটার মধ্যে বেশ খানিকটা সত্যি আছে, তাই না?

কিশোর বাদুড় চেষ্টা আর ভুলের মধ্য দিয়ে শিখে অভিজ্ঞ শিকারি হয়ে ওঠে
ছবি ৬: অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বাদুড় ভালো শিকার বাছতে শেখে।

শেষ কথা: ভুল করেই শেখা

বিজ্ঞানীদের মতে, কিশোর বাদুড়েরা চেষ্টা আর ভুলের মধ্য দিয়ে শেখে, কোনটা ভালো শিকার আর কোনটা নয়। আমরা মানুষও অনেক সময় এভাবেই শিখি।

ভাবো তো, একটা ছোট্ট বাচ্চা কীভাবে বোঝে কোন খাবার তার পছন্দ? সে সবকিছু মুখে দিয়ে দেখে! বাবা-মা যতই বলুক “করলা খুব মজার”, বাচ্চা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। নিজে খেয়ে দেখলে তবেই বুঝবে।

শব্দকোষ

আড়ি পাতা (Eavesdropping)

অন্য প্রাণীর শব্দ লুকিয়ে শুনে দরকারি খবর জেনে নেওয়া, যেমন খাবারের খোঁজ বা বিপদের আভাস। মানুষের বেলায় মানে লুকিয়ে অন্যের কথা শোনা।

অ্যাকোস্টিক (Acoustic)

শব্দ-সংক্রান্ত। শব্দ কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে ছড়ায় আর কীভাবে আমরা শুনি, সেসবের সঙ্গে জড়িত।

শ্রবণসংক্রান্ত (Auditory)

শোনা বা কানে শোনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কন্ট্রোল (Control)

পরীক্ষার তুলনার মাপকাঠি। এতে পরীক্ষার মূল জিনিসটা দেওয়া হয় না, যাতে বোঝা যায় ফলাফল সত্যিই সেই কারণে এসেছে, নাকি এমনিই।

ইকোলোকেশন (Echolocation)

নিজে শব্দ করে তার প্রতিধ্বনি শুনে চারপাশের জিনিস বা শিকারের অবস্থান বোঝা।

ফ্রিকোয়েন্সি (Frequency)

শব্দের সুর কতটা উঁচু বা নিচু। নিচু ফ্রিকোয়েন্সি মানে গম্ভীর সুর।

কিশোর (Juvenile)

যে প্রাণী এখনো পুরোপুরি বড় হয়ে ওঠেনি।

সঙ্গী-ডাকা ডাক (Mating call)

সঙ্গী পাওয়ার জন্য প্রাণীর নিজের প্রজাতির অন্যদের ডাকা শব্দ।

খাওয়ার উপযোগী / অযোগ্য (Palatable / Unpalatable)

উপযোগী খাবার নিরাপদ আর পুষ্টিকর। অযোগ্য খাবার ক্ষতি করতে পারে, কিংবা শুধু খেতে ভালো না-ও লাগতে পারে।

বিষাক্ত (Poisonous)

যা খেলে, ছুঁলে বা কখনো কখনো শ্বাসে নিলেও ক্ষতি হয় বা অসুস্থ করে।

শিকারি ও শিকার (Predator ও Prey)

যে প্রাণী অন্য প্রাণীকে ধরে খায়, সে শিকারি। যাকে ধরে খাওয়া হয়, সে শিকার।

প্রজাতি (Species)

একই রকম বৈশিষ্ট্যের জীবের দল, যারা নিজেদের দলের সদস্যদের সঙ্গে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

নিজেকে যাচাই করো

১ ব্যাঙ আর টোড শিকার করতে ঝালরঠোঁটি বাদুড় কী ধরনের শব্দ শোনার চেষ্টা করে?

২ শিকারের সময় প্রাপ্তবয়স্ক আর কিশোর বাদুড়ের আচরণে কী তফাত দেখা গেল? এর কারণ কী হতে পারে?

৩ পরীক্ষায় বাদুড়কে সাদা শব্দ শোনানো হলো কেন?

৪ ধরো, তোমার বাড়িতে কয়েকজন বন্ধু আসবে, আর তুমি তাদের জন্য খাবার বানাতে চাও। তোমার বানানো খাবার তাদের খাওয়ার জন্য ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করার কী কী উপায় আছে, তার একটা তালিকা বানাও।

৫ ঝালরঠোঁটি বাদুড় শিকারের ডাক শুনে তাকে চেনে। আরও কোন কোন প্রাণীর শোনার ক্ষমতা দারুণ, খুঁজে বের করো। একটা বেছে নিয়ে ছোট একটা উপস্থাপনা বানাও, যেখানে থাকবে প্রাণীটি কীভাবে শব্দ কাজে লাগায়।

তথ্যসূত্র আর ছবির কথা

মূল গবেষণা: Logan S. James, M. Teague O’Mara, Justin C. Touchon, Michael J. Ryan, Ximena E. Bernal ও Rachel A. Page (২০২৫), The ontogeny of decision-making in an eavesdropping predator, Proceedings of the Royal Society B. https://doi.org/10.1098/rspb.2025.0450

Bat Conservation International: Fringe-lipped bat (Trachops cirrhosus). https://www.batcon.org/bat/trachops-cirrhosus/

Purdue University: Study Reveals How Eavesdropping Predators Develop Hunting Strategies (মে ২০২৫)।

ছবি: এই লেখার সব ছবি (প্রচ্ছদ, মানচিত্র, আড়ি পাতার ছবি, ব্যাঙ-টোডের ছবি, পরীক্ষার ছবি, ফলাফলের ও শেখার ছবি) এই লেখার জন্য আলাদাভাবে আঁকা। মানচিত্রে উপকূলরেখার তথ্য GSHHG ডেটাসেট থেকে। ছবি ৫ একটি সরল ধারণাচিত্র, আসল সংখ্যার লেখচিত্র নয়।

Back to Blog